প্রতিষ্ঠাতা পরিচিতি

09

আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানী নগর এর প্রতিষ্ঠাতা

জামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা, মুসলিহে উম্মত, আলিমে রব্বানী শায়খ ইদ্রিস সন্দিপী (রহঃ) ছিলেন বাংলাদেশের সে সমস্ত নিবেদিত আলিম দ্বীনের পুন্যবান দাঈদের অন্তর্ভূক্ত, যাঁরা যৎসামান্য আহার্য ও জীর্ণশীর্ণ বস্ত্রখন্ডের প্রতি তুষ্ট আল্লাহ তা’আলার বাণী সুউচ্চ করা এবং রাসুলে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নতের পূনর্জীবনের জন্য নিজেদের জীবনকে জীবনকে ওয়াকফ করে ছিলেন। তিনি বহু মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। বহু মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহন করেছেন। এভাবে তিনি তা’লীম তা’লীম (শিক্ষা), তরবিয়ত (দীক্ষা) এবং সম্ভাব্য সকল সযোগীতার মাধ্যমে শতাধিক মাদরাসার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। সে সমস্ত মাদরাসাগুলোর মধ্যে অধিকাংশ মাদরাসাতেই জামে মসজিদ ও হিফযুল কুরআনের সতন্ত্র বিভাগ রয়েছে। তিনি হাজার হাজার আলিম জন্ম দিয়েছেন। অসংখ্য-অগণিত মানুষকে হেদায়েতের পথ প্রদর্শন করেছেন। লক্ষাধিক মানুষ তাঁর হাতে হাত রেখে নিজেদের অতীত গুনাহ থেকে তাওবা করেছে। তিনি ছিলেন অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ও সুগভীর বিবেচনা শক্তির অধিকারী। বিদআত ও কুসংস্কারের প্রতিক রূপে পরিচিত তথাকথিত বহু আলিমদের সাথে তিনি বিতর্ক করেছেন। নিঃসন্দেহে তিনি সে সমস্ত সৌভাগ্যবান মানুষের অন্তর্ভুক্ত, যাঁদের ব্যাপারে কুরআন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-                من المؤمنين رجال صدقوا ما عاهدوا الله عليه, فمنهم من قضى نحبه, ومنهم من ينتظر, وما بدلوا تبديلا.
অর্থঃ মু’মিনদের মাঝে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের একদল তো জীবনায়ু পূর্ণ করেছে, আর একদল অপেক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের কোন অঙ্গিকার পরিবর্তন করেনা। ( সুরা আহযাব-২৩)
জন্মঃ
তিনি বর্তমান চট্রগ্রাম জেলাধীন সন্ধীপ থানার সন্তোষপুর গ্রামে ১৯৩১ সনে ইসায়ীতে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পিতার নাম মুন্সী আব্দুল গণী। তিনি ছিলেন ছয় ভাই-বোনের মধ্যে সর্ব কনিষ্ঠ।
শিক্ষাজীবনঃ
তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন নিজ গ্রাম স্নতোষপুরে। তারপর মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য বশীরীয়া মাদরাসা নামে প্রসিদ্ধ সন্দিপের একটি মাদরাসায় ভর্তি হন। তখন তাঁর বাবা ইন্তিকাল করেন। কয়েক বছর পর তাঁর মা জননীও দুনিয়া থেকে থেক বিদায় গ্রহন করেন। তবে তাতে তিনি ভেঙ্গে পড়েন নি। আল্লাহর দরবারে তার কিছু প্রাপ্তির আশা রেখে ইল্‌মের পথে অগ্রসর হন এবং উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য নোয়াখালী জেলার ইসয়ামিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে তিনি পূর্ণ কৃতিত্বের সাথে লেখাপড়া শেষ করেন। তারপর ধর্মীয় উচ্চতর শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে ভারত ভারত উপমহাদেশের বেসরকারী মাদরাসাগুলোর প্রাণকেন্দ্র “জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম দেওবন্দ” গমন করেন। দীর্ঘ চার বছর অধ্যয়নের পর  ১৩৭৫ হিজরীতে সেখানে শিক্ষা সমাপ্ত করেন।
শিক্ষা সমাপনের পর শায়খ সন্দিপী (রহঃ) তাঁর মহান শিক্ষক, অশুভ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন থেকে ভারতবর্ষকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে যাঁর সবচে’ বড় অবদান ছিল, সেই বীর মুজাহিদ শায়খুল ইসলাম মাওলানা সাইয়্যেদ হোসাইন আহমদ মাদানী (রহঃ)-এর সান্নিধ্য গ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘ দু’বছর শায়খুল শায়খুল ইসলাম (রহঃ)-এর চৌকাঠে পড়ে থাকেন এবং শায়খের মধ্যে নিজেকে বিলিন করে দেন। আধ্যাত্মিক শিক্ষা অর্জনের পথে নিজের সবকিছু বিসর্জন করে দেন। এভাবে এক সময় শায়খুল ইসলাম হযরত মাদানী যখন দেখলেন, তার শিষ্য আত্মশুদ্ধির সকল স্তর অতিক্রম করে নিয়েছে, তখন তিনি তাঁকে খেলাফত দানে ভূষিত করেন এবং বলন- এখন নিজ অঞ্চলে ফিরে গিয়ে দ্বীনি কাজ শুরু করো। আমি আশাবাদি, আল্লাহ তোমার দ্বারা তাঁর তাঁর দ্বীনের কাজ নিবেন এবং দেশের আনাচে-কানাচে বরং পৃথিবীর দিক দিগন্তে তোমার সুনাম ছড়িয়ে দিবেন।
কর্মজীবনঃ
শায়খ সন্দিপী (রহঃ) দারুল উলুম দেওবন্দে চার বছর এবং নিজ শায়খ শায়খুল ইসলাম মাদানী (রহঃ)-এর সান্নিধ্যে দু’বছর এভাবে ইল্‌ম ও আত্মশুদ্ধির পথে মোট ছ’বছর দেশের বাইরে অতিবাহিত করেন। তারপর নিজ মাতৃভূমি সন্দিপে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি উক্ত বছরের মধ্যে একবারও বাড়ি আসেন নি।
বস্তুত, শায়খ সন্দিপী (রহঃ)-এর জীবনটি ছিল একটি আদর্শ জীবন। কীর্তি ও কর্মে সমৃদ্ধ জীবন। তিনি এমন সব কাজ করেছেন, যা বিশেষত সম্প্রতি একই ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব হতে সাধারণত দেখা যায় না। আমরা তাঁর জীবন-কর্মকে তিন ভাগে ভাগ করতে পারিঃ ১. দাওয়াত ২. তালীম ৩. তাযকিয়া। শেষ নিঃশাস ত্যাগ করা পর্যন্ত এই তিনটি দিকই ছিল তাঁর সকল চেষ্টা-সাধনার মিলন মোহনা।
দাওয়াতঃ
দাওয়াত ও তাবলীগ ছিল শায়খ সন্দিপী (রহঃ)-এর মিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। মূলত, মুসলমানদের আকীদা-বিশ্বাস ও  আমল-আখলাক সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলীগের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা একটি পরীক্ষিত বিষয়। তাই তিনি এই মোবারক প্রোগ্রামে বিভিন্ন সময়ে বের হতেন, এবং তাঁর সকল মুরীদ বরং তাঁর সাথে কোন না কোন ভাবে সম্পর্কীত সকলকে তাবলীগে বের হওয়া অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিতেন। তিনি তাঁর মাদরাসাসমুহের ছাত্র-শিক্ষক সকলকে বছরের বিভিন্ন ছুটিতে বিশেষত রমযানের বড় বন্ধে এই মহৎ কাজে অংশগ্রহণ করার প্রতি উৎসাহিত করতেন। এবং কোন মাদরাসায় শিক্ষক নিয়োগের সময় উক্ত শিক্ষকের তাবলীগে ‘সাল’ লাগানো হয়েছে কিনা, সে বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে লক্ষ্য করতেন। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম ও অসামান্য ত্যাগের বিনিময়ে দাওয়াতের মিশনকে দেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছিয়ছেন।
তা’লীমঃ
শায়খ সন্দিপী (রহঃ) দ্বীনের সঠিক শিক্ষাকে দেশের প্রতিটি গ্রামে ব্যাপক করার উদ্দেশ্যে নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা ব্যয় করেছেন। তিনি এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে মাদরাসা কাসেমুল উলুম সন্তোষপুর, জামিয়া ইসলামিয়া নরসিংদী, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানী নগর-ঢাকাসহ দেশ জুড়ে শতাধিক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। যেমনটি পূর্বে বলা হয়েছে। তিনি এ সকল মাদরাসা সুশৃংখলভাবে পরিচালনার জন্য “তা’লীমী বোর্ড মাদারিসে কাওমিয়া আরাবিয়া, বাংলাদেশ” নামে একটি স্বতন্ত্র বোর্ডও প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই বোর্ড-এর তত্বাবধানে বিভিন্ন শ্রেনীর কেন্দ্রীয় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এই বোর্ড শায়খের সমস্ত মাদরাসার স্বপ্ন বাস্তবায়নে ও সমস্যা সমাধানে সদা জাগ্রত থাকে। যখনই কোন মাদরাসার কোন সমস্যা তাঁর সামনে উপস্থিত হত, অথবা তাঁর সকাশে কোন প্রয়োজনের ক্তহা তুলে ধরা হত, তিনি আল্লাহর ফজলে উক্ত সমস্যার বিস্ময়কর সমাধান পেশ করতেন, এবং প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করতেন। এলাকাবাসী, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও আলিম সমাজ সবাই নির্বাকে তাঁর সিদ্ধান্ত মেনে নিতেন।
তায্‌কিয়াঃ
শায়খ সন্দিপী (রহঃ) মানুষের ইসলাহে নফ্‌স্‌ তথা আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে দেশের অধিকাংশ জেলা ও থানায় সফর করেছে। তাঁর হাতে হাত রেখে লক্ষাধিক মানুষ নিজেদের অতীত গুনাহ থেকে তাওবা করেছেন। তাঁর সাথে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আলিম-ওলামাও সম্পর্ক রাখতেন। তিনি এই সব সফরে এমন সব কষ্ট হাসিমুখে বরণ করতেন, যা দর্শকদেরকে রীতিমত অবাক করে দিত। যেগুলো দেখে ও শুনে মহান পূর্বসুরীদের ঘটনাবলী স্বরণ হত। শায়খের তত্বাবধানে প্রতি ইংরেজী মাসের জুমাবার দারুল উলুম মাদানীনগর মাদরাসার জামে মসজিদে ইসলাহী জোড় তথা আত্মশুদ্ধির জলসা অনুষ্ঠিত হতো। দারুল উলুম মাদানীনগর মাদরাসার ইসলাহী জোড়ে রাজধানী ঢাকা ও পাশ্ববর্তী জেলাসমুহের তাঁর মুরীদ ভক্তবৃন্দ উপস্থিত হতেন। তাছাড়া প্রতি বছর দারুল উলুম মাদানীনগর মাদরাসার প্রাঙ্গনে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তিন দিন ব্যাপী এক ইসলাহী জোড় অনুষ্ঠিত হত। তাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তাঁর অসংখ মুরীদ ও ভক্তবৃন্দ জমায়েত হতেন। এই সুযোগে প্রত্যেকে তাঁর সাথে সাক্ষাত করাকে সুযোগের সদ্ব্যবহার মনে করত। তারঁ সাথে যে কেউ সামান্য সময় কথা বলত, তখন সে নিজের মনে এমন এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করত, যা প্রকাশ করার উপযুক্ত শব্দ খুঁজে পেত না। এবং তাঁর শুন্য হৃদয়টি আনন্দে ভরে যেত।
উল্লেখ্য যে, শায়খ সন্দিপী (রহঃ) এর সমস্ত এ সমস্ত তৎপরতা  আল্লাহর ফজলে এখনো তাঁর অনুসৃত পদ্ধতিতেই অব্যাহত আছে। তিনি তাঁর মুরীদ ও ভক্তবৃন্দের জন্য “রাহে সালেকীন” নামে একটি পুস্তকও রচনা করেছেন।
আরো উল্লেখ্য যে, শায়খ সন্দিপী দারুল উলুম দেওবন্দে শিক্ষা সমাপনের পর দেশে ফিরে এসে দারুল উলুম সন্দিপ মাদরাসায় কিছুদিন অধ্যাপনা করেন। সন্দিপের কাঠগড় এলাকায় অবস্থিত আলিয়া মাদরাসার প্রধান শিক্ষক হিসেবেও বেশ কিছুদিন কাজ করেন। তিনি হোসানিয়া হোসাইনিয়া কাসেমুল উলুম সন্তোষপুর মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে তাতে শিক্ষকতা করেন। শায়খ সন্দেপী প্রায় ত্রিশ বছর সন্দিপেই অবস্থান করেন। এ সময় তাঁর শত শত হাফেজ ও আলিম জন্ম নেয়। যে সকল অভিভাবক নিজেদের সন্তানদের ধর্মীয় তরবিয়তের ব্যাপারে ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতেন, তারা উক্ত মাদরাসায় নিজেদের সন্তানদের আগ্রহের সাথে পাঠাতেন।
তাঁর দাওয়াত, তা’লীম ও তাযকিয়া সংক্রান্ত সকল ততপরতা যেন সুষ্ঠভাবে পরিচালিত হয় এবং সেগুলোর পরিধি যেন আরো বিস্তৃত লাভ করে, সে উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর জীবন সায়াহ্নে পৌঁছে “তাহ্‌রীকে ইসলাহে উম্মত, বাংলাদেশ” নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্টা করেন।