আরবী ভাষার প্রতি জামিয়ার গুরুত্বারোপ

প্রধানত চারটি কারণে আরবী ভাষা পৃথিবীর প্রচলিত ভাষাসমুহের মধ্যে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভাষা হিসেবে পরিগণিত।
১. আরবী ভাষা কুরআন-হাদীসের ভাষা। ফিকাহ সহ ইসলামী অন্যান্য বিষয়ের মৌলিক উৎস গ্রন্থগুলোও রচিত হয়েছে আরবী ভাষায়। সুতরাং একজন মানুষের আরবী ভাষা জ্ঞানের পরিধি যত বিস্তৃত হবে, কুরআন-হাদীস তথা ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখার সরাসরি জ্ঞান আহরণ করা তার পক্ষে তত সহজ হবে। বস্তুত, আরবী ভাষার গভীরতা অর্জন ও ভাষাতত্ত্বে পারদর্শী হওয়া ব্যতীত ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে পরিপক্কতা অর্জন করা কিছুতেই সম্ভব নয়।
২. আরবী ভাষা পৃথিবীর প্রায় ২৩ টি দেশের  মাতৃভাষা।
৩. অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে সম্প্রতি আরবী ভাষা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। যার প্রমাণ হল, আরবী ভাষা জাতিসংঘের ব্যবহৃত ভাষাসমুহের মধ্যে অন্যতম।
৪. তাছাড়া ( জামিয়ার শিক্ষক মাওলানা সাঈদ আহমদ-এর ভাষায়) কোন জাতির অস্তিত্ব ও স্থায়ীত্বের জন্য পারস্পারিক যে বন্ধনটি মূল ভিত্তি রূপে কাজ করে তা ততক্ষণ পর্যন্ত সচল ও কার্যকর হওয়া সম্ভব নয়, যতক্ষন পর্যন্ত তাদের মাঝে এমন একটি জাতীয় ভাষা না থাকবে, যে ভাষায় একজন অপরজনের নিকট মনের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করবে।  আর এই ভাষাটিই হবে সেই জাতির এক অঙ্গ থেকে অন্য অঙ্গ অথবা এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চিন্তা-চেতনা এবং ভাব ও ভাবনা স্তানান্তর করার একক সহজ বাহন। বলা বাহুল্য, দেশ ও ভূখন্ডের বিভিন্নতা সত্বেও একমাত্র আরবী ভাষাই সারা পৃথিবীর সমস্ত মুসলমানদের এই প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। কারণ, আরবী তাদের ধর্মীয় ভাষা।

সুতরাং আগামী দিনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রচার-প্রসারের মহান দায়িত্ব পালনে যারা অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করবে, তাদের জন্য আরবী ভাষা ভালভাবে আয়ত্ব করা এবং বক্তৃতা ও লিখন উভয় ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করা জরুরী। কিন্তু অত্যন্ত অনুতাপের সঙ্গে যে বাস্তবটি স্বীকার করাই শ্রেয় তা হল, ভারত উপমাহাদেশের মাদরাসাগুলোর শিক্ষার্থী ও সেগুলো থেকে শিক্ষা সমাপনকারী ছাত্র সমাজের মধ্যে একটি ভাষা রূপে আরবী ভাষা চর্চা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। বরং অবস্থা তো এই যে, প্রতি বছর বিরাট সংখ্যায় এমন অসংখ্য শিক্ষার্থী শিক্ষা সমাপন করে মাস্টার ডিগ্রী সার্টিফিকেট অর্জন করছে, যাদের আরবী ভাষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক শাস্ত্রগুলোর সাথেও সম্পর্ক সুদৃঢ় নয়। এর ফল যা হবার তা-ই হচ্ছে। উচ্চতর সার্টিফিকেট অর্জন করার পরও নিজেদের ইলমী ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা দূরীকরণের লক্ষ্যে এবং নিজেদেরকে ইল্‌মী ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে কাজ করার যোগ্য বানানোর উদ্দেশ্যে তারা দিশেহারা হয়ে ঘুরে।
সে তীব্র প্রয়োজনীয়তা ও এই দুঃখজনক বাস্তবতার প্রতি লক্ষ্য রেখে জামিয়া ১৪২৩-২৩ হিজরী (২০০৩ ইং) শিক্ষাবর্ষের সূচনা থেকে জামিয়া ও দেশের অন্যান্য মাদ্‌রাসা থেকে শিক্ষা সমাপনকারী ছাত্রদের জন্য قسم اللغة العربية وآدابها বা ‘আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ’ নামে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ চালু করেছে। জামিয়া এর পাশাপাশি সকল ছাত্রদের জন্য النادي الأدبي বা ‘সাহিত্য আসর’ নামে আরবী সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক একটি সংস্থাও উদ্বোধন করেছে।
এ ক্ষেত্রে জামিয়া জামিয়া ১৩৮৪ হিজরী/১৯৬৪ ঈসায়ীতে ভারত উপমহাদেশের আরবী ভাষার প্রতিভাবান শিক্ষক মাওলানা ওয়াদুজ্জামান কিরানভী (রহ.) দারুল উলুম দেওবন্দের ছাত্রদের জন্য যে النادي الأدبي প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা থেকে উতসাহ লাভ করেছে। قسم اللغة العربية وآدابها  ( আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ) ও النادي الأدبي ( সাহিত্য আসর) সন্সথাদু’টি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব এই লেখকের উপর অর্পন করা হয়েছে। এই লেখকও দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে শিক্ষা সমাপন করেছে।
আল্লাহর কৃপা ও অনুগ্রহে এ বিষয়ে জামিয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের চেষ্টা-সাধনা যথেষ্ট স্ফল হয়েছে, যার প্রাথমিক সাক্ষ্য রূপে   النهضة اللإسلامية ( ইসলামী জাগরণ) আরবী সাময়িকী-এর নাম উল্লেখ করা যায়। সাময়িকীটি আরবী ভাষা আরবী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের প্রথম বছরের ছাত্রদের উদ্যোগে ১৪২৪ হিজরী-এর রজব মাসে প্রকাশিত হয়। ১০০ পৃষ্ঠা সম্বলিত এই সাময়িকীতে আরব বিশ্বের সামনে ‘মুসলিম বাংলাদেশে’র কিছু প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা আশাবাদী। এভাবে আরবী সাময়িকী প্রকাশ করা আগত প্রত্যেক বছরের ছাত্রদের সাধারণ নিয়মে পরিণত হবে। আমীন।